ফ্রান্সে স্কুলের নাজুক পরিবেশ, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষা খাতে নানা সমস্যার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থনে মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে বিতর্কের কারণে কর্মসূচিকে ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ ও অংশগ্রহণকারীরা। শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বামপন্থী বিরোধী দল ফ্রান্স আনবোডের সমর্থনে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে মিছিলের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সজুড়ে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন এবং প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করে আসছেন। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সোমবার দেশটির ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩০টি বন্ধ ছিল। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্কুল বন্ধের সংখ্যা কমলেও সহিংসতা বাড়ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্যারিসের ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিও বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি ও প্রস্তাব কর্তৃপক্ষ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
আন্দোলনে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাসের ক্যানিস্টারের আঘাতে কয়েকজন তরুণ গুরুতর আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে। বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের ঘটনায় ৬ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
অন্যদিকে, বিক্ষোভের সময় কয়েকজন শিক্ষক, স্কুলকর্মী ও পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। সোমবার মার্সেইয়ের কাছে একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও আরেক শিক্ষককে গুলি করে আহত করার ঘটনায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে বিবেচনা করছে।
গত সপ্তাহের আন্দোলনের পর সরকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১১৪টি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রায় ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন এই উদ্যোগকে অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটি উচ্চবিদ্যালয়গুলোর জন্য অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সমাধানে আলোচনা ও সময়ের প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে আন্দোলন নিয়ে মতভেদ রয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও। কেউ শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের দাবিকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ অবরোধের কারণে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
এদিকে, শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আরও বড় বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ আশা করছে, স্কুলের সমস্যা নিয়ে শুরু হওয়া কর্মসূচি ওই বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে ফ্রান্সে শিক্ষা খাতের সংকট নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মন্তব্য করুন