বিশ্বের আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এমন জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও সক্রিয় হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) সম্প্রতি নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এবারের এল নিনো গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, বন্যা, দাবানল এবং খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে। আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এল নিনো হলো নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তিত হয়, যা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ধরনের আবহাওয়াগত প্রভাব সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষভাগ এবং ২০২৭ সালের শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২.৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এর আগে ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনোকে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমান পূর্বাভাস বলছে, এবারের এল নিনো সেই রেকর্ডও অতিক্রম করতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল নয়। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবকে আরও তীব্র করে তোলে।
অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর পরবর্তী বছরগুলোতে বৈশ্বিক তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। সে কারণে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছর হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। কোথাও দীর্ঘমেয়াদি খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা, সাহেল অঞ্চল, সোমালিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং এশিয়ার কয়েকটি এলাকায় খাদ্য উৎপাদন ও পানিসম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
বিশ্বের অনেক অঞ্চল ইতোমধ্যেই যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং খাদ্যঘাটতির চাপে রয়েছে। এর মধ্যে শক্তিশালী এল নিনো কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, ফলে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, কৃষি উৎপাদন কমে গেলে বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এখনই প্রস্তুতির সময়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে আগাম প্রস্তুতি, খরাসহিষ্ণু ফসলের ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জোরদারের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পূর্বাভাস সত্য হলে আগামী বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। তাই সরকার, কৃষি খাত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

মন্তব্য করুন