https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
দেশে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে এফএসআরইউ দুর্ঘটনা, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি, দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং অর্থনীতির বাড়তে থাকা চাহিদা একসঙ্গে কাজ করেছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, গ্যাস সরবরাহ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউ মেরামত করা হয়েছে। তবে বর্তমানে যে গ্যাসের কার্গো রয়েছে, সেটি সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। শিগগিরই এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তারা।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের জন্য শুধু বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা ঠিক হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, এফএসআরইউতে দুর্ঘটনার কারণে কয়েক দিনের সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য ছিল। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
তবে সরকারের ব্যবস্থাপনায় কোনো অদক্ষতা বা সমস্যা থাকলে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা। কোথাও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বদলি করে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সংকটকে শুধু সাম্প্রতিক ঘটনার ফল হিসেবে দেখলে হবে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের দেশীয় জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে বাড়তে থাকা চাহিদা—সব মিলিয়েই গ্যাসের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুটের মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে এই চাহিদা আরও বাড়বে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধিকে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, গত বছরের একই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১২ থেকে ১৪ ডলারের মধ্যে। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে দাম ৩০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এবং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির কারণে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ এলএনজির বড় ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউরোপীয় দেশগুলোও গ্যাসের মজুত বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে বেশি দামে গ্যাস আমদানি করে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হবে, নাকি স্বল্পমেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া হবে—সরকারকে এমন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা। ১ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও পুনঃখননের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকেও দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আনা হবে, নাকি এলএনজিতে রূপান্তর করে আনা হবে—তা নিয়ে আলোচনা চললেও দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত রয়েছে উল্লেখ করে জাহেদ উর রহমান বলেন, বিভিন্ন জরিপে ৪০ থেকে ৫০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস থাকার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়লে এই চাহিদা আরও বাড়বে।
শিল্পকারখানা সচল রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান উপদেষ্টা। পাশাপাশি গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমানো এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, গ্যাসের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। কাতারের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে আরও গ্যাস পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে বলে সরকার আশাবাদী। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভালো অবস্থায় ফিরতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে পুরো সময় পরিস্থিতি খারাপ থাকবে। ধাপে ধাপে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলেও জানান তিনি। কোনো কোনো ডিলার বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন না করায় কিছু এলাকায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আগামী দিনে বিশ্বজুড়ে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে উল্লেখ করে ‘এল নিনো’র সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিব রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।