অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সংস্কারকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, আর ঘাটতি থাকবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
বর্তমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেটের আকার ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, যা প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ বাজার পরিস্থিতির কারণে এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচিসহ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পাশাপাশি উপকারভোগীর সংখ্যাও বাড়ানো হবে।
সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রধান উৎস হিসেবে থাকছে। এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং অটোমেশন জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের জন্য উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে। তবে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য ধাপে ধাপে সমন্বয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণ, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে। এ লক্ষ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এবারের বাজেটে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ ধারণা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং ও সাংস্কৃতিক শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন। সরকার আশা করছে, প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শুরু রোববার : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বাজেট অধিবেশন আগামী রোববার (৭ জুন) শুরু হচ্ছে। বিকেল ৩টায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে অধিবেশনটি বসবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ অধিবেশন আহ্বান করেছেন।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন উপলক্ষে প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। এ অধিবেশনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন এবং তা পাসের কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গত ৭ মে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে অধিবেশন আহ্বানের বিষয়টি জানানো হয়।
প্রতি বছরের জুন মাসে জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য সংসদের বাজেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এবারও নতুন অর্থবছরের বাজেটের মাধ্যমে সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরা হবে। বাজেটের ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনা করবেন।