ঢাকা
২৭ আগস্ট ২০২৬

চা শ্রমিকের এ কেমন জীবন!

নিজস্ব প্রতিবেদক
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬   ৩৮ বার পঠিত
চা শ্রমিকের এ কেমন জীবন!

ছবি: -সংগৃহীত

এক কাপ চা অনেকের কাছে প্রশান্তি, ক্লান্তি দূর করার অবলম্বন কিংবা আড্ডার সঙ্গী। কিন্তু সেই চায়ের কাপে যে স্বস্তি মিশে থাকে, তার পেছনের মানুষের জীবনটা কতটা অনিশ্চয়তা আর বঞ্চনায় ভরা—সেটি খুব কমই আলোচনায় আসে। আন্তর্জাতিক চা দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের জীবনের যে বাস্তবতা উঠে এসেছে, তা দেশের অন্যতম পুরোনো শিল্পের এক নির্মম দিককেই সামনে আনে।

চট্টগ্রামে আঠারো শতকে উপমহাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা চাষ শুরু হয়েছিল। শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। চা শিল্প বিস্তৃত হয়েছে, ব্যবসা বেড়েছে, দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের গুরুত্বও বেড়েছে। কিন্তু চা বাগানের শ্রমিকদের জীবনযাত্রায় সেই উন্নয়নের ছাপ খুব একটা পড়েনি। বিশেষ করে ফটিকছড়ির চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের জীবন এখনও দারিদ্র্য, অপ্রতুল মজুরি এবং মৌলিক অধিকার বঞ্চনার মধ্যেই আটকে আছে।

বর্তমানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৭৮ টাকা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময়ে এই অর্থে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা কঠিন। শ্রমিকরা বলছেন, কাজ না করলে সেই টাকাও মেলে না। ফলে অসুস্থতা, দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে কাজ বন্ধ থাকলে পুরো পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।

ফটিকছড়ির এক চা শ্রমিক বলেন, সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার পরও যে মজুরি পাওয়া যায়, তা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে উঠেছে। একই বাগানের আরেক শ্রমিক হনুফা বেগমের কথায় উঠে আসে আরও কঠিন বাস্তবতা। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে সন্তান আর গবাদিপশু নিয়ে বসবাস করতে হয় তাদের।

শ্রমিকদের অভিযোগ শুধু কম মজুরি নিয়েই নয়। অধিকাংশ চা বাগানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ স্যানিটেশন কিংবা বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়। নারী ও শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তার অবস্থাও দুর্বল। শ্রম আইন এবং শ্রমিকদের সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তির শর্তও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।

চা শ্রমিক নেতারাও বলছেন, এই শিল্পের পুরো ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে শ্রমিকদের ঘাম আর শ্রমের ওপর। কিন্তু শিল্পের প্রসার ঘটলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়নি। পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকারের ভাষায়, উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও শ্রমিকদের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

চা শ্রমিকদের অনেকেই বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের কাছে চা বাগান শুধু কর্মস্থল নয়, পুরো জীবনব্যবস্থা। তাই তারা প্রায়ই বলেন, চা গাছ যেমন ২৬ ইঞ্চির বেশি বড় হতে পারে না, তেমনি তাদের জীবনও যেন একটি নির্দিষ্ট সীমার পর আর এগোয় না।

জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২১ মে-কে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। দিবসটির উদ্দেশ্য ছিল চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে চায়ের অবদানকে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন এখনও রয়ে গেছে নানা বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তায় ঘেরা।

সবুজ চা বাগানের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের আড়ালে তাই লুকিয়ে আছে অসংখ্য শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। আন্তর্জাতিক চা দিবসে যখন চায়ের ঐতিহ্য, রপ্তানি ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়, তখন চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মানবিক জীবন এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে আসে।

August 2026
SMTWTFS
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031