বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পুলিশ বাহিনীর পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট এবং পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মানবিক সমস্যাও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির ইন্টেরিয়র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভী।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ, আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আলোচনার শুরুতে চলতি বছরের মে মাসে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ওই সফরের ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন ইতিহাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ ১৪ বছর পর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঢাকা-করাচি রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু হওয়ায় দুই দেশের জনগণের যোগাযোগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বৈঠকে পাকিস্তানে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মানবিক সংকটের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেন তিনি। প্রয়োজনীয় পারিবারিক নথির অভাবে অনেকেই পাকিস্তানের জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে জটিলতায় পড়ছেন, যার কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানান মন্ত্রী। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে দ্রুত স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
আধুনিক নগর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশটির ৪০টিরও বেশি শহরে বাস্তবায়িত ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য কার্যকর মডেল হতে পারে। তিনি জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, লাহোর, মুলতান ও করাচির নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের শহরগুলোকে আরও নিরাপদ করতে পাকিস্তানের কারিগরি ও কৌশলগত সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তাদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানে পাকিস্তানের সহযোগিতাও চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, অতীতে সৌদি আরবে অবস্থানরত অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যৌথভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকটে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ জোরদারে পাকিস্তানের ধারাবাহিক সমর্থনও প্রত্যাশা করেন, যাতে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়।
বৈঠকের একপর্যায়ে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে সুবিধাজনক সময়ে সফরটি সম্পন্ন করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

মন্তব্য করুন