https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ইউরোপের অর্থনীতিতে ক্রমেই গভীর প্রভাব ফেলছে। বাড়তি জ্বালানি ব্যয় একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন অর্থনৈতিক তথ্য ও জরিপে দেখা গেছে, ইউরোজোনজুড়ে ব্যবসায়িক কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি এখনো ১৯৭০-এর দশকের মতো উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও স্থবির প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে না পৌঁছালেও এটি করোনাভাইরাস মহামারির পর শুরু হওয়া জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটকে আরও তীব্র করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য সুদের হার নির্ধারণ এবং জনগণকে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্তও আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল–এর জরিপ অনুযায়ী, মে মাসে ইউরোজোনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম গত আড়াই বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত হারে সংকুচিত হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সেবাখাতে চাহিদা কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয়ের মূল্যস্ফীতি সাড়ে তিন বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে ইউরোপীয় কমিশন ইউরোজোনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। কমিশনের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বছরের শেষ পর্যন্ত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
ইউরোজোনের বাইরে যুক্তরাজ্য–এও ব্যবসায়িক কার্যক্রম এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাও এর জন্য দায়ী।
ইউরোজোনের যৌথ ব্যবসায়িক কার্যক্রম সূচক মে মাসে ৪৮ দশমিক ৮ থেকে কমে ৪৭ দশমিক ৫–এ নেমেছে, যা অক্টোবর ২০২৩–এর পর সর্বনিম্ন। সাধারণত ৫০–এর নিচে এ সূচক থাকলে অর্থনৈতিক সংকোচন নির্দেশ করে।
মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান–এর বিশ্লেষকেরা বলেছেন, ২০২৩ সালের শেষ দিকের পর এটি সবচেয়ে দুর্বল পরিস্থিতি এবং মে মাসে অর্থনীতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইউরোপের বৃহত্তম অর্থনীতি জার্মানি–তে মে মাসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বেসরকারি খাতের কার্যক্রম কমেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স–এর প্রধান ব্যবসায়িক সূচক সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
বুন্ডেসব্যাংক জানিয়েছে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থির থাকতে পারে।
ইউরোজোনজুড়ে নতুন রপ্তানি আদেশ কমে গেছে এবং সেবাখাতে নতুন ব্যবসার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদন খাতেও চাহিদা আবার কমতে শুরু করেছে।
ইউরোজোন অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত সেবাখাতের কার্যক্রম ফেব্রুয়ারি ২০২১–এর পর সবচেয়ে দ্রুত হারে সংকুচিত হয়েছে। মে মাসে এ খাতের সূচক ৪৭ দশমিক ৬ থেকে কমে ৪৬ দশমিক ৪–এ দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের মূল্যস্ফীতি সাড়ে তিন বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া মূল্যও ৩৮ মাসের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল সতর্ক করেছে, আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।
শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ইউরোজোনের কোম্পানিগুলো টানা পঞ্চম মাস কর্মী ছাঁটাই করেছে। চাকরি কমানোর হার নভেম্বর ২০২০–এর পর সর্বোচ্চ বলে জানা গেছে।
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মাসে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও জুনে আবার সুদ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে এরপর তারা বিরতি দেবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের বিশ্লেষক অ্যান্ড্রু কেনিংহ্যাম বলেছেন, জুনে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ সুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরে আসবে—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে মন্দার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৩ শতাংশ, যা ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
ইউরোপীয় কমিশনের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোজোনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ০ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ১ দশমিক ৩ শতাংশ। আর ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।