https://timenewsbangla.com

দীর্ঘ ১১ বছরের অপেক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ অনুযায়ী সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে।
তবে নতুন বেতন কাঠামোর পুরো সুবিধা একসঙ্গে পাবেন না সরকারি চাকরিজীবীরা। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। আর বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে।
সরকারের হিসাবে, নতুন পে-স্কেলের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। পুরো স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
নিচের গ্রেডে বেতন বাড়ছে বেশি
নতুন পে-স্কেলেও বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে নিচের গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে।
প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত শুরুর মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এরপর নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার আরও বেশি।
১৩তম গ্রেডে শুরুর মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার টাকা। ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার টাকা থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা এবং ১৯তম গ্রেডে ৮ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় শতাংশীয় বৃদ্ধি হয়েছে ২০তম গ্রেডে। এই গ্রেডে শুরুর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১৪২ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
দ্বিতীয় গ্রেডে মূল বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে।
কোন গ্রেডে কত শতাংশ বাড়লো
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
– ১ম থেকে ১১তম গ্রেড: ১০০ শতাংশ
– ১২তম গ্রেড: ১১৫ শতাংশ
– ১৩তম গ্রেড: ১১৮ শতাংশ
– ১৪তম গ্রেড: ১৩০ শতাংশ
– ১৫ ও ১৬তম গ্রেড: ১৩৫ শতাংশ
– ১৭তম গ্রেড: ১৩৮ শতাংশ
– ১৮তম গ্রেড: ১৩৯ শতাংশ
– ১৯তম গ্রেড: ১৪১ শতাংশ
– ২০তম গ্রেড: ১৪২ শতাংশ
সরকারের যুক্তি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তাদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানো হয়েছে।
বেতন বাড়লেও পুরো টাকা এখনই হাতে নয়
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ঘোষিত নতুন মূল বেতন একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে তিন ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ নতুন স্কেলে যে বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে, তার পুরো সুবিধা পেতে সরকারি চাকরিজীবীদের অপেক্ষা করতে হবে।
অন্যদিকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ নতুন স্কেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভাতা নতুন হারে কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।
ফলে কাগজে-কলমে বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়লেও বাস্তবে একজন কর্মচারীর হাতে মাসে কত টাকা বাড়বে, তা নির্ভর করবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ভাতা সমন্বয়ের ওপর।
পেনশনেও বড় পরিবর্তন
বর্তমান পেনশনভোগীদের মধ্যে যারা তুলনামূলক কম পেনশন পান, তাদের বেশি সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে বৃদ্ধির হার হবে—
– ৯ হাজার টাকা বা কম: ১০০ শতাংশ
– ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা: ৭৫ শতাংশ
– ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা: ৬৫ শতাংশ
– ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা: ৬০ শতাংশ
– ৪০ হাজার ১ টাকা বা বেশি: ৫৫ শতাংশ
‘এক পদ এক পেনশন’ এখনই নয়
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির ‘এক পদ এক পেনশন’ বা ‘ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সঙ্গে চালু হচ্ছে না।
সরকার জানিয়েছে, এর সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক দায় জড়িত। পাশাপাশি অসামরিক কর্মচারীদের ২০১৯ সালের আগের অবসরসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা
নতুন পে-স্কেলে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া এতদিন মূলত পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে সীমিত থাকা মোবাইল ভাতার আওতা বাড়িয়ে সব গ্রেডের কর্মচারীকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাস্তব সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন
দীর্ঘ ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল অনুমোদনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তিন ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সাবেক সভাপতি বেলাল হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি ও সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে তিন ধাপে বাস্তবায়নের কারণে কর্মচারীরা ঘোষিত সুবিধা কতটা দ্রুত পাবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, বর্তমান বেসিক, চাকরির মেয়াদ, ইনক্রিমেন্ট, সার্ভিস বেনিফিট ও বিভিন্ন ভাতা কীভাবে নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, তা পরিষ্কার না হলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত ধারণা পাওয়া কঠিন।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নিয়েও আলোচনা
নতুন পে-স্কেল অনুমোদনের পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর বিষয়েও মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।