মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে কবিতা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদাহরণ অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি শরণার্থীদের দুর্দশা নিজ চোখে দেখে তিনি এই কবিতা রচনা করেন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্মৃতি-৭১ আয়োজিত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ স্মারক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের এই অকৃত্রিম বন্ধুকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশি শরণার্থীদের মানবিক বিপর্যয় দেখে অ্যালেন গিন্সবার্গ গভীরভাবে মর্মাহত হন। শরণার্থী শিবির ও যশোর সড়ক ঘুরে দেখা অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি লেখেন।
দীর্ঘ এই কবিতায় শরণার্থীদের ক্ষুধা, দুর্ভোগ, মহামারি এবং সেই সময়ের মানবিক সংকট উঠে আসে। পরে কবিতাটিতে সুরারোপ করা হলে তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানে কবিতাটির অংশবিশেষ বাংলা ও ইংরেজিতে আবৃত্তি করেন নাজনিন পাপ্পু ও ফারুক এইচ খান।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের স্মৃতিচারণ করেন ভাস্কর বন্দোপাধ্যায়। তিনি জানান, পাকিস্তানি বাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর সময় তিনি খুলনায় ছিলেন। পরে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে ভারতে যাওয়ার পথে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বহু মানুষকে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। ভারতে শরণার্থী শিবিরে থাকার সময়ের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন তিনি।
ভাস্কর বন্দোপাধ্যায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার শরণার্থীদের জীবন, ভারতের সহযোগিতা এবং সেই সময়ের মানবিক বিপর্যয় নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এ ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে প্রামাণ্যচিত্র, বই ও কবিতার মতো মাধ্যম ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শরণার্থী শিবিরসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহের স্মৃতিচারণ করেন সংগীতশিল্পী শাহিন সামাদ। তিনি কয়েকটি গান পরিবেশন করেন এবং শিশু-কিশোরদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করতে অভিভাবকদের নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক লেখা, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র হলেও শরণার্থীদের নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কাজ হয়েছে। ১৯৭১ সালে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং ভারত সরকার তাদের সহায়তা করেছিল। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শঙ্কর লাল সাহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিরাজ ফরাজি ও মাহবুব জামান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন জিনাত আরা হক।

মন্তব্য করুন