https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ নয়, বরং নিবন্ধন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় এনে শৃঙ্খলা ফেরাতে চায় সরকার। এ জন্য প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারে কঠোর শর্ত আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর উত্থাপিত নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও এর কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা চালুর পর লাল বাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও অতিরিক্ত গতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম কমেছে। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এসব যানের অধিকাংশের নম্বর প্লেট না থাকায় ক্যামেরায় অনিয়ম শনাক্ত হলেও চালক বা গাড়ির বিরুদ্ধে জরিমানা কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে অটোরিকশা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। তাই এসব যান পুরোপুরি বন্ধ না করে কাঠামোগত পরিবর্তন, নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান দেশের গ্রামীণ ও নগর পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব যানকে কেন্দ্র করে চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবাদাতাদের নিয়ে বড় ধরনের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। ফলে অটোরিকশা বন্ধ না করে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। ঢাকায় প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে বছরে সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-এসিড ব্যাটারি নিয়েও উদ্বেগের কথা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এসব ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় সিসাসহ ক্ষতিকর পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বাতাস, মাটি ও পানি দূষিত হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল বন্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
তবে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বা জব্দ নয়, একটি সমন্বিত নীতিমালার দাবি জানান সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। তিনি বলেন, প্রতিদিন ঢাকায় প্রায় ৩০০টি নতুন অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। এসব যানকে নির্দিষ্ট এলাকার সড়কে চলাচলের অনুমতি, বিআরটিএর নিবন্ধন, জোনিং ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের চূড়ান্ত করা ওই নীতিমালায় চালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নীতিমালার আওতায় অটোরিকশার ডিজিটাল নিবন্ধন করা হবে। প্রতিটি যানে থাকবে কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা। এর ফলে একটি নিবন্ধন নম্বরের বিপরীতে অবৈধভাবে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ থাকবে না।
এ ছাড়া লেড-এসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারে কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে। সরকার জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত এই নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে বলে সংসদে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।