এআই, ড্রোন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির নতুন দক্ষতা যুক্ত; শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাচ্ছে কর্মক্ষেত্র ও প্রশিক্ষণ
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন, পেশার চাহিদা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাও। চীনের সাংহাইয়ে শেষ হওয়া ৪৮তম ওয়ার্ল্ডস্কিলস প্রতিযোগিতায় উঠে এসেছে সেই পরিবর্তনের চিত্র। রোববার শেষ হওয়া চার দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় ৬৮টি দেশ ও অঞ্চল থেকে অংশ নেন ১ হাজার ৩৮৫ জন প্রতিযোগী। ৬৪টি দক্ষতা নিয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে সাতটি বিভাগ। এর মধ্যে রয়েছে চালকবিহীন আকাশযান, সফটওয়্যার টেস্টিং ও খুচরা বাণিজ্যের মতো ক্ষেত্র।
চীন ৬৪টি দক্ষতার সবকটিতে অংশ নিতে ৭১ জন প্রতিযোগী পাঠিয়েছিল। ‘মডার্ন এক্সপ্রেস’-এর তথ্যমতে, পূর্ব চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ১১ জন প্রতিযোগীর সবাই পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁরা নয়টি দক্ষতায় পাঁচটি স্বর্ণপদক, দুটি রৌপ্যপদক এবং দুটি ‘মেডালিয়ন ফর এক্সিলেন্স’ অর্জন করেন।
ওয়ার্ল্ডস্কিলস ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস হুরান্ট বলেন, বর্তমান সময়ের কারিগরি পেশাগুলো ১৯৬০-এর দশকের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে। শিল্পখাতের বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাখতে প্রতিযোগিতার দক্ষতার তালিকাও নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।
নতুন যুক্ত হওয়া দক্ষতাগুলোর একটি ‘আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস’ বা চালকবিহীন আকাশযান প্রযুক্তি। এই বিভাগে প্রতিযোগীদের প্রায় ২০০টি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে একটি ড্রোন তৈরি ও ক্যালিব্রেট করতে হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রোনটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় কোডও তৈরি করতে হয়েছে। এরপর মানুষের সহায়তা ছাড়াই অপরিচিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, বাধা শনাক্ত, মানচিত্র তৈরি এবং নিজস্ব পথ নির্ধারণের মতো কাজ করতে হয়েছে ড্রোনটিকে।
খুচরা বাণিজ্য বিভাগেও একাধিক ধরনের দক্ষতার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগীদের পণ্য সাজানো, ক্রেতাদের কাছে পণ্যের তথ্য তুলে ধরা, লাইভস্ট্রিম পরিচালনা এবং অভিযোগ সমাধানের মতো বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।
ওয়ার্ল্ডস্কিলস কম্পিটিশন চায়না (তিয়ানজিন) রিসার্চ সেন্টারের উপপরিচালক ঝাং রুই বলেন, শিল্পের বিকাশের সঙ্গে নতুন নতুন পেশার সৃষ্টি হয়। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই প্রয়োজনীয় দক্ষতার ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়। তাঁর মতে, সফটওয়্যার টেস্টিং ও ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাক্টিভ মিডিয়া ডিজাইন ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশকে প্রতিফলিত করছে। আর আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ও রেল ভেহিকেল টেকনোলজি সরাসরি স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির সঙ্গে যুক্ত।
শুধু নতুন পেশাই নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই পুরোনো কাজের ধরনও বদলে দিচ্ছে। ওয়েব টেকনোলজি বিভাগে এখন শুধু কোড লেখার দক্ষতা নয়, ব্যবহারকারীর চাহিদা বিশ্লেষণ, ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী ফিচার নির্ধারণ, ফ্রন্টএন্ড ও ব্যাকএন্ড ডেভেলপমেন্ট এবং পূর্ণাঙ্গ অ্যাপ্লিকেশন তৈরির সক্ষমতাও যাচাই করা হচ্ছে।
চীনা দলের কারিগরি বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষক উ ইংজিয়াং বলেন, এআই কোড তৈরির কাজকে দ্রুত করেছে। ফলে প্রোগ্রামারদের কাজের পরিধিও বাড়ছে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে একজন প্রোগ্রামার একই সঙ্গে প্রজেক্ট বা প্রোডাক্ট ম্যানেজারের দায়িত্বও পালন করতে পারেন। ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাক্টিভ মিডিয়া ডিজাইন বিভাগেও প্রতিযোগীদের বহুমুখী দক্ষতা দেখাতে হয়েছে। চার দিনে ২০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাঁরা পণ্য পরিকল্পনা, ইমেজ প্রসেসিং, ভিডিও তৈরি এবং ইন্টারঅ্যাকশন ডিজাইনের মতো বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করেছেন।
হুরান্টের মতে, এআই ও মানুষের দক্ষতার বিষয়টি একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে বাদ দেওয়ার মতো নয়। বরং এটি শ্রম বিভাজনের একটি নতুন রূপ। মানুষের দক্ষতা ও এআইয়ের সক্ষমতার সমন্বয়েই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে চীনের বৃত্তিমূলক শিক্ষাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত জুলাইয়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার তালিকায় ২৭টি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই, স্বল্প-উচ্চতার আকাশসীমাভিত্তিক অর্থনীতি, উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি এবং হিউম্যানয়েড রোবট-সম্পর্কিত শিক্ষাক্রম।
সাংহাই ইনফরমেশন টেকনোলজি কলেজও এআই শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী চারটি নতুন কর্মসূচি চালু করেছে। এসব কর্মসূচিতে বাস্তব উৎপাদন পরিস্থিতি, কারিগরি মানদণ্ড এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পকে প্রশিক্ষণের অংশ করা হয়েছে।
শিল্পের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশিক্ষণকে সামঞ্জস্য রাখতে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। পূর্ব চীনের জিয়াংসি সফটওয়্যার ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে একটি শিল্পপার্কের সঙ্গে ক্যাম্পাসকে যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
সাংহাই ইনফরমেশন টেকনোলজি কলেজের উপাধ্যক্ষ সান পেংতাও বলেন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা কোনো প্রতিষ্ঠানের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষাক্রমও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।

মন্তব্য করুন