ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য বিতর্কিত গোল রয়েছে। তবে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ গোলের মতো এত আলোচিত, বিতর্কিত এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে—এমন ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা সেই গোল আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। রাজনৈতিক উত্তেজনার রেশ থাকায় ম্যাচটি ছিল বাড়তি গুরুত্ব ও আবেগে ভরপুর। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর দ্বিতীয়ার্ধে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
আর্জেন্টিনার এক আক্রমণে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার স্টিভ হজ ভুল করে বলটি নিজেদের পেনাল্টি এলাকায় পাঠিয়ে দেন। ভাসমান বলের দিকে একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটন। উচ্চতায় পিছিয়ে থাকায় ম্যারাডোনা বাঁ হাত দিয়ে বলটি জালে পাঠিয়ে দেন। রেফারি গোলের বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি উদ্যাপন শুরু করেন। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা হ্যান্ডবলের অভিযোগ তুলে তীব্র প্রতিবাদ করলেও সিদ্ধান্ত আর বদলানো হয়নি।
অদ্ভুত বিষয় হলো, এই বিতর্কিত গোলের মাত্র চার মিনিট পরই ম্যারাডোনা নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়কে কাটিয়ে আরেকটি অসাধারণ গোল করেন। সেই গোলটি পরবর্তীতে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা। পরে বেলজিয়াম ও পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে দলটি।
গোলটি বাতিল না হওয়ার কারণ ছিল সে সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। তখন ভিডিও সহকারী রেফারির ব্যবস্থা ছিল না। মাঠের রেফারি আলী বিন নাসের এবং সহকারী রেফারি বোগদান দোচেভ—দুজনেরই চোখ এড়িয়ে যায় ম্যারাডোনার হ্যান্ডবল। ফলে গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে আলী বিন নাসের বলেন, খেলোয়াড়দের অবস্থানের কারণে তিনি ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে দেখতে পারেননি। তাই তিনি সহকারী রেফারির দিকে তাকান। সহকারী রেফারি কোনো অনিয়মের সংকেত না দেওয়ায় তিনি গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
অন্যদিকে বোগদান দোচেভ পরে জানান, তিনি কিছুটা অনিয়মের আভাস পেলেও সে সময়ের নিয়ম অনুযায়ী সহকারী রেফারির স্বাধীনভাবে রেফারির সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ ছিল না। ফলে তিনি কোনো আপত্তি জানাননি।
ম্যাচ শেষে গোলটি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ম্যারাডোনা রসিকতার সুরে বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে ‘কিছুটা আমার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ তার সেই মন্তব্য থেকেই গোলটির নাম হয়ে যায় ‘ঈশ্বরের হাত’।
প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও এই গোল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে। বর্তমান সময়ে ভিডিও সহকারী রেফারির প্রযুক্তি থাকলে গোলটি নিশ্চয়ই বাতিল হতো। কিন্তু ১৯৮৬ সালের সেই সিদ্ধান্ত এখন ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মন্তব্য করুন