ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি—আর্জেন্টিনার ফুটবলের দুই ভিন্ন যুগের দুই মহাতারকা। তাদের উপস্থিতি শুধু মাঠের পারফরম্যান্সেই সীমাবদ্ধ ছিল না, জাতীয় দলের পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। তাই এমন একজন খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে গেলে প্রশ্ন ওঠে, তার শূন্যতা কীভাবে পূরণ করবে দল?
ম্যারাডোনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় আসে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে। নিষিদ্ধ বস্তুর পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার পর টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান তিনি। এরপর শেষ ষোলোতে রোমানিয়ার কাছে হেরে বিশ্বকাপ শেষ করে আর্জেন্টিনা। সেখানেই জাতীয় দলের হয়ে ম্যারাডোনার অধ্যায়ও শেষ হয়ে যায়।
ম্যারাডোনার বিদায়ের পর ১০ নম্বর জার্সির দায়িত্ব যায় আরিয়েল ওর্তেগার হাতে। কিন্তু তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা পূরণ করা সহজ হয়নি। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে লাল কার্ড দেখার পর আর্জেন্টিনার বিদায় আরও হতাশাজনক হয়ে ওঠে।
তবে ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে একজন খেলোয়াড়কেন্দ্রিক দল থেকে সমষ্টিনির্ভর দলে পরিণত হতে থাকে। অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও ঘুরেছে একাধিক তারকার হাতে। সিমিওনে, ভেরন, বাতিস্তুতা, সোরিন ও মাসচেরানোর মতো খেলোয়াড়রা বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই আর্জেন্টিনা একাধিক প্রতিভাবান প্রজন্ম তৈরি করে। ২০০৬ বিশ্বকাপে হুয়ান রোমান রিকেলমে ছিলেন দলের সৃজনশীলতার কেন্দ্রবিন্দু। সেই দলেই তরুণ লিওনেল মেসির আবির্ভাব ঘটে। ১৯ নম্বর জার্সিতে শুরু করা সেই তরুণই কয়েক বছর পর আর্জেন্টিনার নতুন ১০ নম্বর হয়ে ওঠেন।
২০১০ বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা। কোচ হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ম্যারাডোনা। প্রত্যাশার চাপ ছিল বিপুল। তবে জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে টুর্নামেন্ট শেষ হয় আর্জেন্টিনার। এরপর ধীরে ধীরে মেসিকে কেন্দ্র করেই জাতীয় দলের নতুন যুগ গড়ে ওঠে।
মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত ২০২২ বিশ্বকাপে বিশ্বকাপের শিরোপা জেতে। ফলে ম্যারাডোনার পর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে। কিন্তু এখন মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও শেষের দিকে পৌঁছানোয় আবারও সামনে এসেছে পুরোনো প্রশ্ন—তার পর আর্জেন্টিনার পথ কী হবে?
ইতিহাস অবশ্য দেখায়, আর্জেন্টিনার প্রতিভার ভাণ্ডারে কখনোই বড় ঘাটতি ছিল না। ম্যারাডোনার পরও তারা একের পর এক বিশ্বমানের খেলোয়াড় পেয়েছে। তবে এমন একজন খেলোয়াড় পাওয়া, যিনি একই সঙ্গে মাঠে সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও প্রতিপক্ষের ওপর নির্ধারক প্রভাব বিস্তার করবেন—সেটিই ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
মেসির পরও তাই আর্জেন্টিনার সামনে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন ১০ নম্বর, নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন কৌশল হয়তো দলটিকে আবারও ভিন্ন পথে এগিয়ে নেবে। ম্যারাডোনার পর যেমন আর্জেন্টিনা দীর্ঘ সময় নিয়ে নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল, মেসির পরও সেই প্রক্রিয়া ফিরে আসতে পারে।
হয়তো আরেকজন মেসি বা ম্যারাডোনা পাওয়া যাবে না। তবে তাদের পরবর্তী সময়ের ইতিহাস বলে, একজন মহাতারকার বিদায় মানেই আর্জেন্টিনার গল্পের সমাপ্তি নয়; বরং সেটি হতে পারে নতুন এক ফুটবল-অধ্যায়ের শুরু।




মন্তব্য করুন