ঢাকা-চীনের গুয়াংজু আকাশপথে যাত্রীদের ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রা, ওষুধ, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সীমিতসংখ্যক মধ্যস্থতাকারী এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাদের সঙ্গে ঢাকার বিমানবন্দরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চীনে অবস্থানরত কয়েকজন নাগরিকের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রকাশের আগে সংগ্রহ করা প্রয়োজন। ফলে এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়।

যাত্রীদের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের অভিযোগ

অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে চীনে মার্কিন ডলার, সৌদি রিয়াল, কুয়েতি দিনার, বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, পুরোনো মোবাইল ফোনের LCD, ক্যামেরা ও অন্যান্য পণ্য নেওয়া হয়। বিপরীতে চীন থেকে বাংলাদেশে পুরোনো ও কপি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, মেমোরি কার্ড, সানগ্লাস, ইন্টারনেট সরঞ্জাম, সিগারেট, মদ ও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আনার অভিযোগ রয়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে সাধারণ যাত্রীদের লাগেজ বা বহনক্ষমতা ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রতি মোবাইল ফোন বহনের জন্য প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা এবং ল্যাপটপের জন্য ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।
এভাবে অতিরিক্ত আয়ের আশায় যাত্রীরা অন্যের পণ্য বহন করলেও কাস্টমস তল্লাশিতে ধরা পড়লে মূল ঝুঁকির মুখে পড়েন ওই যাত্রীরাই।

বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশ হলো ঢাকার বিমানবন্দরে কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথিত আর্থিক সমঝোতা। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে কিছু যাত্রীকে অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে গ্রিন চ্যানেল পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
এছাড়া বিমানবন্দরের বোর্ডিং গেট এলাকায় অর্থের বিনিময়ে ডলার, সৌদি রিয়াল ও কুয়েতি দিনারসহ বৈদেশিক মুদ্রা বহনের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন বা নথি এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কাস্টমস ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।

কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

অভিযোগপত্রে মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. আব্দুল মালেক, হিরা/উজ্জ্বল, মামুন ওরফে ‘কোট মামুন’, রবিউল ডালি/রজিনা এবং মাসুদ, মামুন, কবির, রশেল ও রাজা নামে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, হুন্ডি, অবৈধ ওষুধের ব্যবসা, যাত্রীদের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন এবং মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ আত্মসাতের মতো বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে ‘হ্যান্ড-ক্যারি’ কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি তাদের চীনা নাগরিকদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত। এটি সত্য হলে বিষয়টি মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের আওতায় তদন্তের দাবি রাখে। তবে এ অভিযোগের পক্ষেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের কাছে নেই।

অর্থ দ্বিগুণ করার প্রলোভনের অভিযোগ

দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদেশে আসা ব্যবসায়ী ও ভ্রমণকারীদের অর্থ দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশেষ একটি অ্যাপের মাধ্যমে ১০০ ডলারকে ২০০ ডলারে রূপান্তরের মতো প্রলোভন দেখানো হতো।
অন্যদিকে আব্দুল মালেক নামে আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং ডলার ও সৌদি রিয়াল পাচারের অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগকারীদের মতে, কথিত এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বহন করছেন সাধারণ যাত্রীরা। অন্যের পণ্য বহনের বিনিময়ে সামান্য অর্থ পেলেও কাস্টমসের হাতে পণ্য আটক হলে জরিমানা, জিজ্ঞাসাবাদ কিংবা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাত্রীর পণ্য আটক হওয়ার পর মধ্যস্থতাকারীরা নিজেদের পণ্য সরিয়ে নেন এবং পরবর্তী সময়ে জব্দ হওয়া পণ্য ছাড়ানোর জন্য যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। এতে একদিকে সাধারণ যাত্রীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে ঢাকা–গুয়াংজু রুটের বৈধ ব্যবসা ও বাংলাদেশি যাত্রীদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

তদন্তের দাবি

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে ঢাকা-গুয়াংজু রুটে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের প্রবণতা, বৈদেশিক মুদ্রা বহনের তথ্য, কাস্টমসের জব্দ তালিকা, বিমানবন্দরের সিসিটিভি ফুটেজ, যাত্রীদের লাগেজ তল্লাশির রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক লেনদেন তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।