সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও দেশের এভিয়েশন মহলে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে মাঝআকাশে দুই যাত্রীর মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে শুরু হওয়া এই মারামারিতে একপর্যায়ে সাধারণ যাত্রী, নারী ও শিশুদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেবিন ক্রু ও অন্য যাত্রীরা মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও এ ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—মাঝআকাশে এমন বিশৃঙ্খলা বা চরম নিরাপত্তা সংকট সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের কতটা রয়েছে?

স্থলপথে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া সম্ভব। কিন্তু ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে উড্ডয়নরত বিমানে সেই সুযোগ থাকে না। কেবিন ক্রুদের মূল দায়িত্ব যাত্রীসেবা ও জরুরি নিরাপত্তা প্রটোকল পালন করা; দৈহিক সংঘর্ষ বা উগ্র সন্ত্রাসী হামলা প্রতিহত করার মতো প্রশিক্ষণ বা সরঞ্জাম তাদের থাকে না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যই আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলে ‘এয়ার মার্শাল’ বা ‘স্কাই মার্শাল’ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে।

এয়ার মার্শাল কী?

সামরিক পরিভাষায় ‘এয়ার মার্শাল’ একটি উচ্চপদস্থ পদবী হলেও আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে এরা পরিচিত ‘ইন-ফ্লাইট সিকিউরিটি অফিসার’ (IFSO) হিসেবে। সহজ কথায়, এয়ার মার্শাল হলেন বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনপ্রয়োগকারী বা সামরিক কর্মকর্তা, যিনি সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে ফ্লাইটে অবস্থান করেন। মাঝআকাশে বিমান ছিনতাই, সন্ত্রাসী আক্রমণ বা চরম উচ্ছৃঙ্খল আচরণ কঠোর হাতে প্রতিহত করাই তাদের মূল দায়িত্ব।

বিশ্বের বেশ কিছু দেশ তাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে স্কাই মার্শাল নিয়োজিত রেখেছে:

যুক্তরাষ্ট্র: নাইন-ইলেভেনের হামলার পর তারা ‘ফেডারেল এয়ার মার্শাল সার্ভিস’ (FAMS) ব্যাপকভাবে চালু করে। ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে তাদের অফিসাররা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন।

ভারত: ১৯৯৯ সালে কান্দাহার বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনার পর ভারত সরকার স্কাই মার্শাল নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটির এলিট কমান্ডো বাহিনী ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (NSG)-এর সদস্যরা নিয়মিত এয়ার ইন্ডিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটের ফ্লাইটে ছদ্মবেশে নিয়োজিত থাকেন।

জার্মানি ও অস্ট্রিয়া: জার্মানির কেন্দ্রীয় পুলিশ এবং অস্ট্রিয়ার বিশেষ টাস্কফোর্স ‘ইকেও কোবরা’ স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত তাদের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বিমানে পাঠায়।

ইসরায়েল: দেশটির পতাকাবাহী বিমান সংস্থা ‘এল আল’-এর প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত (Shin Bet)-এর কমান্ডোরা সাধারণ পোশাকে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কঠোর নিরাপত্তার কারণে ১৯৬৮ সালের পর এল আল-এর কোনো ফ্লাইট ছিনতাই করা যায়নি।

বাংলাদেশের এয়ার রেজিমেন্টের সম্ভাব্য ভূমিকা

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাঝআকাশের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের ‘এয়ার রেজিমেন্ট’ সরাসরি দায়িত্ব নিতে পারে। এয়ার রেজিমেন্ট মূলত বিমান ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত হলেও সুনির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের এয়ার মার্শাল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

১. বিশেষায়িত কেবিন কমব্যাট প্রশিক্ষণ: যাত্রীবাহী বিমানের সংকীর্ণ করিডোরে খালি হাতে বা সাধারণ অস্ত্রের মাধ্যমে আক্রমণকারীকে ঘায়েল করার জন্য কেবিন ক্লোজ কোয়ার্টার ব্যাটল (CQB) প্রশিক্ষণ জরুরি।

২. ফ্র্যাঞ্জিবল অ্যামুনিশন ব্যবহার: সাধারণ বুলেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিমানের ধাতব দেয়াল বা জানাল ভেদ হয়ে কেবিন প্রেশারাইজেশন নষ্ট হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। এয়ার মার্শালদের বিশেষ ‘ফ্র্যাঞ্জিবল অ্যামুনিশন’ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা লক্ষ্যবস্তুর শরীরে আঘাত করলে কার্যকর হলেও বিমানের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে না।

৩. যাত্রীর আচরণ পর্যবেক্ষণ (বিহেভিওরাল প্রোফাইলিং): ফ্লাইটে ওঠার আগে এবং উড্ডয়নকালে যাত্রীদের অস্বাভাবিক শারীরিক ভাষা বা সন্দেহজনক নড়াচড়া আগেভাগেই শনাক্ত করার কৌশল এদের প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

৪. কৌশলগত ও গোপনীয় মোতায়েন: প্রতিটি ফ্লাইটে নয়, বরং ঝুঁকি বিবেচনা করে নির্দিষ্ট ও আন্তর্জাতিক সংবেদনশীল রুটে এদের মোতায়েন করা যেতে পারে। বিমানে তাদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন থাকবে; কেবল পাইলট-ইন-কমান্ড জানবেন তাদের উপস্থিতি।

বাস্তবায়নে করণীয়

বাংলাদেশে এয়ার রেজিমেন্টকে এই দায়িত্ব দিতে হলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমন্বিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে সশস্ত্র মার্শাল রাখার জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO) এনেক্স ১৭ নীতিমালা অনুযায়ী গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।

মাঝআকাশে যাত্রীদের হাতাহাতির সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ভিডিও নয়, বরং আকাশপথের নিরাপত্তার দুর্বলতার একটি বাস্তব সতর্কবার্তা। এয়ার রেজিমেন্টের দক্ষ জনবলকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক বিমানে একটি পেশাদার এয়ার মার্শাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে তা যাত্রী সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের এভিয়েশন খাতের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তামানও বাড়াবে।