প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিয়ানমারের নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে মালয়েশিয়া। মঙ্গলবার এএফপির সাংবাদিকরা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ প্রত্যক্ষ করেন। কুয়ালালামপুরের দাবি, আটক কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক ‘স্বেচ্ছায়’ দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, আটক কেন্দ্রের কঠিন পরিস্থিতির কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। দীর্ঘদিনের সংঘাতে থাকা মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

প্রথম দলে কতজন রোহিঙ্গা রয়েছেন, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য দেয়নি। মিয়ানমারে ফিরে গেলে রোহিঙ্গারা নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

এএফপির সাংবাদিকরা মঙ্গলবার উত্তর-পশ্চিম মালয়েশিয়ার লুমুত নৌ-ঘাঁটির কাছে মজলিস পারবানদারান মাঞ্জুং স্টেডিয়ামে পুলিশি পাহারায় কয়েকটি বাস পৌঁছাতে দেখেন। সেখানে প্রত্যাবাসনের আগে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার কথা ছিল। এরপর তাদের নিকটবর্তী নৌ-ঘাঁটিতে নিয়ে জাহাজে করে মিয়ানমারে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, জাহাজগুলো চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ইয়াঙ্গুনের দক্ষিণে থানলিয়িন নৌ-ঘাঁটিতে পৌঁছাতে পারে। সামুদ্রিক নৌ-চলাচল বিষয়ক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সহায়ক ও হাসপাতাল জাহাজ ‘থান লউইন’ নৌ-ঘাঁটির কাছেই অবস্থান করছে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, মালয়েশিয়ায় থাকা প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারের শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা। গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

কুয়ালালামপুরে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার কার্যালয়ের বাইরে শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটকের পর এই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পেনাংয়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কায় সহায়তা চাইতে তারা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। পরে জাতিসংঘের বৈধ নথিপত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সমালোচনার মধ্যেই চলতি মাসের শুরুতে দেশটির সরকার বিদেশে আশ্রয় নেওয়া নাগরিকদের ‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে গত সপ্তাহে ১৬০টিরও বেশি সুশীল সমাজ সংগঠন মালয়েশিয়া সরকারকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানায়।

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংকে সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার নীতিগত অবস্থান ও সুনাম বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ফলে প্রত্যাবাসন ইস্যুতে কুয়ালালামপুর একদিকে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন সংগঠন এ নিয়ে সতর্কতা জানাচ্ছে।

মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত মাসে জানিয়েছিল, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ৫ হাজার নাগরিক স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে যাবেন। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশটির অভিবাসন আটক কেন্দ্রগুলোতে ১০ হাজার ৩৮৮ জন মিয়ানমারের নাগরিক আটক ছিলেন। তবে তাদের সবাই শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃত নন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হলেও মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদে স্বাক্ষর করেনি। ফলে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শরণার্থী মর্যাদাও স্বীকৃত নয়।

এদিকে এএফপির ফ্যাক্ট-চেকাররা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গারা অনলাইনে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব প্রচারণা বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ভীতি উসকে দিচ্ছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযানের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। ওই অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলছে। প্রতিবেশী বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তবে বাংলাদেশ থেকে তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।