হলিউডের অস্কারজয়ী অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির জন্মদিন ছিল গতকাল ৪ জুন। অভিনয়, মানবিক কর্মকাণ্ড, সাহসী ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং জীবনের নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নারী হিসেবে। জন্মদিন উপলক্ষে তুলে ধরা হলো তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যায়।
১৯৭৫ সালের ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্মগ্রহণ করেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। তাঁর বাবা জন ভয়েট হলিউডের খ্যাতিমান অভিনেতা এবং মা মার্শেলিন বার্ট্রান্ডও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের পরিবেশে বেড়ে ওঠায় অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অভিনয় যেন তাঁর রক্তের মধ্যেই ছিল।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের বহু আগে ব্যক্তিগত জীবনে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে জোলিকে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং মানসিক অস্থিরতার সঙ্গে দীর্ঘ সময় লড়াই করেছেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে জোলি জানিয়েছিলেন, কৈশোরে নিজেকে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হতো। সেই কঠিন সময়েই অভিনয়ের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়।
১৯৯৩ সালে ‘সাইবর্গ ২’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হলেও ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি ছোট বাজেটের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রজেক্টে কাজ করেন। ধীরে ধীরে নিজের অভিনয় দক্ষতা শাণিত করে নির্মাতাদের নজরে আসতে সক্ষম হন।
১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গার্ল, ইন্টারাপ্টেড’ চলচ্চিত্রে মানসিকভাবে অস্থির তরুণী লিসার চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন জোলি। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার) লাভ করেন। অনেক সমালোচকের মতে, এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লারা ক্রফট: টুম্ব রেইডার’ চলচ্চিত্র অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়। জনপ্রিয় ভিডিও গেম চরিত্র লারা ক্রফটের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে। এরপর ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া সিক্যুয়েল ‘লারা ক্রফট টুম্ব রেইডার: দ্য ক্র্যাডেল অব লাইফ’-এও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন। দুটি চলচ্চিত্রই তাঁকে হলিউডের শীর্ষ তারকাদের কাতারে নিয়ে যায়।
ক্যারিয়ারের শীর্ষ সময়ে একটি চলচ্চিত্রের জন্য ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়েছেন জোলি। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি প্রযোজনা, পরিচালনা ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো ব্র্যাড পিটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ২০০৪ সালে ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’ চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় তাঁদের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে ২০১৪ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে ২০১৬ সালে জোলি বিচ্ছেদের আবেদন করেন। একসময় ‘ব্র্যাঞ্জেলিনা’ নামে পরিচিত এই জুটি হলিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা দম্পতিদের মধ্যে অন্যতম ছিল।
২০১৩ সালে জোলি প্রকাশ করেন যে, জেনেটিক কারণে তাঁর স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি ছিল। সে কারণে তিনি প্রতিরোধমূলক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দুই স্তন অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই খোলামেলা অবস্থান বিশ্বজুড়ে নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
অভিনয়ের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। ২০০১ সাল থেকে তিনি শরণার্থী ও যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পক্ষে কাজ শুরু করেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর বিশেষ দূত হিসেবে আফগানিস্তান, সিরিয়া, সুদান ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন সংকটপূর্ণ অঞ্চল সফর করেছেন। অনেকের কাছে তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী নন, বরং একজন মানবাধিকারকর্মী।
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির অনেক বক্তব্যই অনুপ্রেরণামূলক হিসেবে পরিচিত। তাঁর আলোচিত উক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘অন্য রকম হওয়া খারাপ নয়, বরং ভালো’ এবং ‘সাহসী সিদ্ধান্ত নাও, ভুল করো, কারণ সেখান থেকেই শেখা আসে।’
অ্যাঞ্জেলিনা জোলির জীবন কেবল একজন সফল অভিনেত্রীর গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। ব্যক্তিগত সংকট, পেশাগত চ্যালেঞ্জ এবং মানবিক দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে তিনি আজও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অনুপ্রেরণাদায়ী নারীদের একজন।