ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়ার রাজধানী আসমারায় নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করে ১০ ইরিত্রীয় কূটনীতিককে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। আদ্দিস আবাবা তাদের বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ এনেছে।

এর জবাবে ইরিত্রিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইথিওপিয়ার পদক্ষেপকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করে এবং সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। ফলে ২০১৮ সালে দুই দশকের বৈরিতা কাটিয়ে যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল, তা আবারও প্রকাশ্য সংকটে রূপ নিল।
এই কূটনৈতিক ভাঙনের পেছনে রয়েছে উত্তর ইথিওপিয়ায় নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত। গত এক সপ্তাহ ধরে দেশটির সেনাবাহিনী ও টিগ্রের পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফসহ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোটের মধ্যে লড়াই চলছে। ইথিওপিয়ার সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল বিরহানু জুলা ইরিত্রিয়া, সুদান ও মিশরের বিরুদ্ধে ওই গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছেন। তিন দেশই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরিত্রিয়ার তথ্যমন্ত্রী ইয়েমানে গেব্রেমেস্কেলও সাম্প্রতিক সংঘাতে তাঁর দেশের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ফলে ইরিত্রিয়া সরাসরি এই লড়াইয়ে জড়িত—এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। উত্তরাঞ্চলের সংঘাতের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও তথ্য এখনও পরস্পরবিরোধী।

ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্কের অবনতির অন্যতম বড় কারণ লোহিত সাগরে ইথিওপিয়ার সরাসরি প্রবেশাধিকারের আকাঙ্ক্ষা। ১৯৯৩ সালে ইরিত্রিয়া স্বাধীন হওয়ার পর স্থলবেষ্টিত হয়ে পড়া ইথিওপিয়া বর্তমানে তার বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি জিবুতির বন্দর দিয়ে পরিচালনা করে।

আরব নিউজকে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ভিজিটিং স্কলার ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা লেসলি অ্যান ওয়ার্নার বলেন, ২০১৮ সালে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পেছনে অভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ টিপিএলএফকে হুমকি হিসেবে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর মতে, পরে টাইগ্রে যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত বিরোধে পরিণত করে।
ওয়ার্নারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের বক্তব্য ইরিত্রিয়ায় বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ইথিওপিয়ার বাণিজ্য জিবুতিমুখী একটি প্রধান করিডোরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বিকল্প সমুদ্রপথের প্রয়োজনীয়তার যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মিরেট মাবরুকও আরব নিউজকে বলেন, সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার আবি আহমেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাঁর মতে, ইথিওপিয়ার এই আকাঙ্ক্ষা ইরিত্রিয়ার মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সংকটের সঙ্গে মিশর ও সুদানের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইথিওপিয়া অন্তত একজন মিশরীয় কূটনীতিককে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কায়রোও পাল্টা একজন ইথিওপীয় কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। একই সময়ে সুদান ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে দেশটির গৃহযুদ্ধে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ তুলেছে; আদ্দিস আবাবা তা অস্বীকার করেছে।

মিশর, সুদান ও ইথিওপিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে গ্র্যান্ড ইথিওপিয়ান রেনেসাঁ ড্যাম বা জিইআরডি নিয়ে বিরোধ চলছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, সুদানের যুদ্ধ এবং উত্তর ইথিওপিয়ার নতুন সংঘাত—এই তিনটি সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আরব নিউজকে মাবরুক বলেন, ইথিওপিয়া ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে চলমান অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের অনেকগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই এবং এসব বক্তব্য পরিস্থিতির উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
২০১৮ সালে আবি আহমেদের নেতৃত্বে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল এবং সীমান্ত পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছিল। ওই সমঝোতার পর আবি আহমেদ ২০১৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু ২০২০-২২ সালের টাইগ্রে যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্ক আবার অবনতির দিকে যায়।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উত্তর ইথিওপিয়ার সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যুক্ত হতে পারে। লেসলি অ্যান ওয়ার্নার মনে করেন, এতে একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ওপর নতুন করে প্রক্সি প্রতিদ্বন্দ্বিতার স্তর যুক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এর প্রভাব হর্ন অব আফ্রিকা ছাড়িয়ে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে। তবে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত অনিবার্য—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।