মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজারের ফেরার তথ্য; প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায় ও নিরাপদ ছিল কি না, যাচাই করতে পারেনি ইউএনএইচসিআর

সোমবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, চলতি বছর মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার অভিবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এর ঠিক আগের দিনই প্রায় ১,৫০০ নাগরিককে বহনকারী একটি নৌবহর মিয়ানমারে এসে পৌঁছায়।

জাতিসংঘ মালয়েশিয়ার এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। একটি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিবাসীদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর এই উদ্যোগটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না বলে জাতিসংঘ মনে করে।

রবিবার ১,৪৭৬ জন প্রত্যাবাসনকারীকে বহনকারী একটি জাহাজ ইয়াঙ্গুনের উপকূলে এসে পৌঁছায়। মালয়েশিয়ায় অভিবাসী-বিরোধী মনোভাবের প্রেক্ষাপটে কুয়ালালামপুর জানিয়েছিল যে মিয়ানমার মোট ৫,০০০ নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে; এই দলটি ছিল তারই প্রথম অংশ।

মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হতে পারে—যেখানে তারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তবে মালয়েশিয়া ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের জাতিগত পরিচয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি।

মিয়ানমার সোমবার জানিয়েছে যে, বিমানযোগে আরও বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন কার্যক্রমও চলছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার’-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে “বিমানযোগে ৮,০৪১ জন নাগরিককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে”।
জাহাজযোগে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি মালয়েশিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেলেও, মিয়ানমার যে সাপ্তাহিক ফ্লাইটের মাধ্যমে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার কথা বলছে, সে বিষয়ে কুয়ালালামপুর কোনো মন্তব্য করেনি।
মিয়ানমারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিমান ও জাহাজযোগে মোট ৯,৫১৭ জন অভিবাসী দেশে ফিরেছেন।

মালয়েশিয়া দাবি করছে যে, তাদের এই কর্মসূচির আওতায় ফেরত আসা ব্যক্তিরা আটক কেন্দ্র থেকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে সম্মত হয়েছেন। মিয়ানমারের ভাষ্যমতে, অভিবাসন সংক্রান্ত অপরাধের সাজা ভোগের পর ওই কেন্দ্রগুলোতে তারা “নানা সমস্যার” সম্মুখীন হয়েছিলেন।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই কেন্দ্রগুলোর শোচনীয় পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। এছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে যে, প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তগুলো “সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ও সঠিক তথ্য জেনে” নেওয়া হয়েছে কি না, তা যাচাই করার সুযোগ তাদের কর্মীদের দেওয়া হয়নি।
পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘অ্যাকলেড’ (ACLED)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিয়ানমারে এক লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর অনেক আগে থেকেই রোহিঙ্গারা দলে দলে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যেতে শুরু করেছিল। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া সামরিক দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে তারা দেশ ছাড়ে; মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই দমন-পীড়নকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে—যদিও দেশটির সেনাবাহিনী বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের ১ লাখ ৯০ হাজার শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই রোহিঙ্গা; সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন-বিরোধী মনোভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এই জনগোষ্ঠী।

রবিবার ইয়াঙ্গুনের ঠিক দক্ষিণে থানলিনে ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসী বহনকারী জাহাজগুলো নোঙর করার পর, এএফপি-র সাংবাদিকরা দেখেন যে তাদের মধ্যে অনেককে পরিচয়পত্র যাচাই ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য একটি মঠের অস্থায়ী কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

‘দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অফ মিয়ানমার’ জানিয়েছে, “তাদের নিজ নিজ এলাকায় নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের সাথে দ্রুত পুনর্মিলন সহজতর করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”