ফিলিস্তিনি আওকাফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার জানিয়েছে যে, সেপ্টেম্বর মাসে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা আল-আকসা মসজিদে ২৬ বার অনুপ্রবেশ করেছে। একই সময়ে কর্তৃপক্ষ ১৫০ বার আজান বা নামাজের আহ্বান প্রচার করতে বাধা দিয়েছে এবং হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদ ছয় দিনের জন্য বন্ধ রেখেছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবস্থিত মুসলমানদের দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পবিত্র স্থানে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের চিত্রই এই পরিসংখ্যানে ফুটে উঠেছে।
এই দুটি পবিত্র স্থানে এসব ঘটনা ও বিধিনিষেধ এমন এক সময়ে ঘটছে যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। সেখানে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, কৃষিজমি ও জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার ব্যাহত হচ্ছে।
ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ‘ওয়াফা’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে আল-আকসা চত্বরের ভেতরে ইহুদি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও প্রকাশ্যে প্রার্থনা করার ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া, ওই স্থানে ইহুদিদের প্রার্থনার অধিকারের পক্ষে সোচ্চার গোষ্ঠীগুলো শনিবারও সেখানে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করে যে, এ ধরনের দাবির উদ্দেশ্য হলো “একটি নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া এবং সময় ও স্থানের ভিত্তিতে বিভাজনকে পাকাপোক্ত করা।”
আল-আকসা পরিচালনার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়ম বা ‘স্ট্যাটাস কো’ অনুযায়ী, মুসলমানরা এই চত্বরে ইবাদত করেন এবং অ-মুসলমানরা নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে পরিদর্শন করতে পারেন, তবে তাঁদের সেখানে প্রার্থনা করার অনুমতি নেই।
মুসলমানদের কাছে ‘আল-হারাম আল-শরিফ’ এবং ইহুদিদের কাছে ‘টেম্পল মাউন্ট’ নামে পরিচিত এই চত্বরটি ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম এবং ইহুদি ধর্মের সবচেয়ে পবিত্র স্থান। দীর্ঘকাল ধরেই এটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের অন্যতম প্রধান উত্তেজনাকর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
এদিকে, মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে ইহুদিদের বিভিন্ন ছুটির দিন বা উৎসবের সময় ইব্রাহিমি মসজিদটি ছয়বার বন্ধ রাখা হয়েছিল। ইহুদিদের কাছে ‘টুম্ব অফ দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’ (পিতৃপুরুষদের সমাধি) নামে পরিচিত এই মসজিদটি মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টান—সবার কাছেই পবিত্র এবং এটি হেবরনের ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অংশে অবস্থিত।
১৯৯৪ সালে ভোরের নামাজের সময় এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর হাতে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লি নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকে এই স্থানটিকে মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য আলাদা প্রার্থনার এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে। ২০১৭ সালে হিব্রনের পুরনো শহর—যার মধ্যে ইব্রাহিমি মসজিদও অন্তর্ভুক্ত—ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা এবং ‘বিপদগ্রস্ত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকা’য় (List of World Heritage in Danger) যুক্ত করা হয়। ওই এলাকায় চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ এবং উপাসনালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার মতো ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড নিয়ে সংস্থাটি বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ফিলিস্তিনি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের শুরু থেকেই ইসরায়েল মসজিদটির পূর্ব দিকের প্রবেশপথ বন্ধ রেখেছে এবং এর জানালাগুলো বিভিন্ন প্রতিবন্ধক দিয়ে ঢেকে রেখেছে।
মন্ত্রণালয়টি সেপ্টেম্বর মাসে অধিকৃত পশ্চিম তীরের অন্যান্য মুসলিম উপাসনালয়ের ওপর প্রভাব ফেলা বিভিন্ন ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছে। তারা জানায়, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরের নাবলুস এলাকায় অবস্থিত ‘ইমাদ আল-দিন জেঙ্গি’ মসজিদে আগুন দেয় এবং এর দেয়ালে বর্ণবাদী স্লোগান লিখে রাখে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নাবলুস এলাকারই মাদামায় বসতি স্থাপনকারীরা একটি নতুন মসজিদে প্রবেশ করে এবং সেখানে উপস্থিত মুসল্লিদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এছাড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জেরিকো গভর্নরেটের আল-জিফতলিক এলাকায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘আল-দুয়াইসাত’ নামের একটি প্রার্থনা কক্ষ গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

মন্তব্য করুন