https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
চট্টগ্রাম বিভাগে গত এক সপ্তাহে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে সেখানে ১ হাজার ৪৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ সারাদেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাত হয় প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার। অর্থাৎ মাত্র এক সপ্তাহেই চট্টগ্রামে দেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের প্রায় ৬৬ শতাংশ বা দুই-তৃতীয়াংশ বৃষ্টি হয়েছে।
অস্বাভাবিক এই বৃষ্টিপাতের ফলে চট্টগ্রাম নগরীতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে, কৃষিজমি তলিয়ে গেছে এবং গবাদিপশুর মধ্যে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, গত এক সপ্তাহের অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এবং দেশের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
তিনি জানান, গত ১২ জুলাই তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। সেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে জলাবদ্ধতার কারণ ও চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রামে বাস্তবায়নাধীন জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হলে নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অতিবৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কক্সবাজার। জেলার কয়েকটি স্থানে পুরোনো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও পোল্ডারের ক্ষতি হয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধের ভেতরে অতিরিক্ত পানির চাপ সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় লোকজন পানি নিষ্কাশনের জন্য বাঁধ কেটে দিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্লুইস গেট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে।
বর্তমান নদ-নদীর পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৪ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ, সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ, সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা এবং তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে কমছে এবং আগামী দু-এক দিনের মধ্যে অধিকাংশ স্থানে তা বিপৎসীমার নিচে নেমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বন্যাকবলিত এলাকায় সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি মেরামত ও বাঁধ সুরক্ষার জন্য ইতোমধ্যে ৭ লাখের বেশি জিওব্যাগ সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরও ৬ লাখ জিওব্যাগ মজুত রাখা হয়েছে, যা প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করা হবে।
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারের বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। তিনি বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি জমিতে জরুরি ভিত্তিতে বীজতলা তৈরি করে কৃষকদের বিনামূল্যে আমন ধানের চারা সরবরাহ করা হবে।
মন্ত্রী জানান, এবারের বন্যায় সদ্য রোপণ করা ১০ থেকে ১৫ দিন বয়সী আমনের চারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করছেন।
তিনি বলেন, আগামী দুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমিতে নতুন বীজতলা তৈরি করা হবে। পানি নেমে গেলে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব চারা বিতরণ করা হবে। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ উপযোগী জাতের ধানের বীজ ব্যবহার করা হবে।
কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, বন্যার কারণে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনো গোখাদ্য সরবরাহ করা হবে এবং খুরা রোগ প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। এছাড়া বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তাদেরও সরকারি সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।