প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা আরও সহজ করার পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানো হচ্ছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শনিবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বে অব বেঙ্গল কনফারেন্সে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে। কৃষিকে খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সুরক্ষিত রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের সেবায় আরও কার্যকরভাবে নিয়োজিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন। সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই হতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত করতে সরকার কাজ করছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিনিয়োগকারীদের নীতিগত নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইউনিভার্সেল কার্ডের আওতায় সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১ লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এর প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার পাশাপাশি মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।
তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণদের বৈশ্বিক কর্মবাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তুলে ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে।
পানি নিরাপত্তার জন্য আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব শিল্প সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য কমানো, জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানো এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা সম্ভব।
বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্য, পর্যটন, জ্বালানি ও আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব। নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করা যাবে। জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করবে বাংলাদেশ।
শান্তি, সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে যৌথ সমৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালনে প্রস্তুত।

মন্তব্য করুন