গাজা উপত্যকার সংঘাত ও সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে আগের কয়েকটি তথ্যচিত্রের প্রচার নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই গাজার জীবনযাত্রা নিয়ে নতুন একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে বিবিসি।
‘গাজা’স কেইসফায়ার সামার’ নামের তথ্যচিত্রটি তৈরি করেছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের আরবি ‘ফরেনসিক টিম’-এর সহযোগিতায় বিবিসি আই। এতে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে গাজার পরিবারগুলোর টিকে থাকার সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের সংকটের মধ্যেও পরিবার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে তৈরি হওয়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশও এতে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হারিয়ে ফেলার প্রভাব নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
তথ্যচিত্রের একটি অংশে ছয় বছর বয়সী রাছিল আল-বালাউইয়ের চিকিৎসার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আল-মাওয়াসি এলাকায় তাঁবুতে হামলায় আহত হওয়ার পর তাকে একাধিক অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে তথ্যচিত্রে জানানো হয়। ওই ঘটনায় তার নয় বছর বয়সী বোন রাতিলে নিহত হয়।
রাছিলের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর না হওয়ার বিষয়টিও তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে। গাজার গবেষকদের উদ্ধৃত করে বিবিসি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় সেখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার প্রবণতা পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিবিসিকে জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্ষতি হলে তারা দুঃখপ্রকাশ করে এবং বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, গাজায় ওষুধ প্রবেশে তারা বাধা দিচ্ছে না এবং মানুষের পানির চাহিদা পূরণেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। হামাস-পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ১ হাজার ৪২১ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে ইসরায়েল আপত্তি জানিয়েছে।
নতুন তথ্যচিত্রটি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হলো, যখন গাজা নিয়ে বিবিসির আগের তথ্যচিত্রগুলোর সম্পাদকীয় পদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক পর্যালোচনা ও বিতর্ক চলছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিবিসির এক অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় বলা হয়, ‘ *গাজা: হাউ টু সার্ভাইব অ্যা ওয়্যারজোন* ’ তথ্যচিত্রটি তথ্যের নির্ভুলতা-সংক্রান্ত সম্পাদকীয় নীতিমালা লঙ্ঘন করেছিল। কারণ, এর ১৩ বছর বয়সী বর্ণনাকারীর বাবা গাজায় হামাস-পরিচালিত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা—এই তথ্যটি দর্শকদের জানানো হয়নি।
পর্যালোচনায় এ তথ্য প্রকাশ না করার জন্য মূলত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান হোয়োহো ফিল্মসকে দায়ী করা হলেও সম্পাদকীয় যাচাইয়ে যথেষ্ট সতর্ক না থাকার জন্য বিবিসিরও সমালোচনা করা হয়। তবে বিবিসির নিরপেক্ষতা নীতি লঙ্ঘন বা বাইরের কোনো পক্ষের অনুপযুক্ত প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এরপর ‘ *গাজা: ডক্টরস আন্ডার অ্যাটাক* ’ তথ্যচিত্রটি সম্প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয় বিবিসি। পরে চ্যানেল ৪ এটি প্রচার করে এবং ২০২৬ সালের বাফটা টেলিভিশন অ্যাওয়ার্ডসে ‘কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স’ বিভাগে পুরস্কার পায়। পুরস্কার গ্রহণের সময় নির্মাতারা বিবিসির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, তাদের প্রকল্পটি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
এদিকে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বিবিসির সম্পাদকীয় মানদণ্ড কমিটির এক সাবেক সদস্যের লেখা একটি ফাঁস হওয়া নথিতে গাজা-সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে সংস্থাটির ভেতরে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলা হয়।
তবে বিবিসি পরিকল্পিত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সংস্থাটির দাবি, গাজা নিয়ে তাদের সংবাদ ও তথ্যচিত্র কঠোর সম্পাদকীয় মানদণ্ড এবং একাধিক স্তরের পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে।

মন্তব্য করুন