মরক্কোর ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফাতিমা জাহরা এল মনসুরিকে নিয়োগ দিয়েছেন দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। এই নিয়োগকে নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও দেশটিতে নারী নেতৃত্ব, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের সংসদ নির্বাচনে মনসুরির অথেন্টিসিটি অ্যান্ড মডার্নিটি পার্টি (প্যাম) সর্বাধিক আসন পেয়ে চার দলীয় জোট গঠন করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির ৩৯৫ আসনের মধ্যে জোটটির দখলে রয়েছে ২০৭টি আসন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মনসুরির নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সাবেক আইনমন্ত্রী মুস্তফা রামিলসহ কয়েকজন ধর্মীয় ব্যাখ্যার প্রসঙ্গ তুলে নারীর দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে থাকার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। স্থানীয় গণমাধ্যমের এক জরিপেও প্রবীণদের মধ্যে নারী সরকারপ্রধানকে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধার চিত্র উঠে এসেছে।
অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম ও নারীদের অনেকে এই নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাঁচ বছর নগর উন্নয়ন ও আবাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মনসুরি বলেছেন, প্রথম নারী সরকারপ্রধান হওয়া শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং মরক্কোর সব নারীর জন্য গর্বের বিষয়।
তবে দেশটিতে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পারিবারিক আইনে উত্তরাধিকার, বিয়ে ও তালাকসংক্রান্ত বিধান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কন্যাসন্তান ছেলের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। ধর্মীয় সর্বোচ্চ পরিষদ উত্তরাধিকার আইনে সমতার দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ২০২৫ সালের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার ৫৫ শতাংশ, যেখানে শহরে এই হার ১০০ শতাংশ। দারিদ্র্য, নিরাপদ পরিবহনের অভাব ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতনতার ঘাটতিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তরুণীরা।
যুক্তরাজ্যের এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আইরিন ফার্নান্দেজ-মোলিনা মনে করেন, কম ভোটার উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা জোরদার করতেও এই নিয়োগ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি একে ‘কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় নারীবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে নারীবাদী কর্মী ইয়াসমিনা বেনস্লিমান মনে করেন, এই নিয়োগ প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তবে মনসুরি বাস্তবে কতটা সংস্কার আনতে পারবেন, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের হাতে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকায় মনসুরির সামনে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাধা রয়েছে। ফলে তাঁর নিয়োগের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে নারী অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠায় সরকারের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের ওপর।

মন্তব্য করুন