বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার রাতে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে একটি বারে যাওয়া অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর সন্ধান পেয়েছে তদন্তকারী দল। সিসিটিভি ফুটেজে ওই তরুণীকে তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে দেখা গেলেও এখনো তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

তদন্তকারীদের ধারণা, ওই তরুণীর পরিচয় জানা গেলে তাহসিফের মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার সূত্র মিলতে পারে। তাই তাঁর সঙ্গে তাহসিফ ও দীপের সম্পর্ক এবং বারে যাওয়ার পর তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও এক তরুণী। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে এবং লিফটে উঠতে দেখা যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে মোটরসাইকেলে চলে যান।

এরপর ওই তরুণী কোথায় যান, তাঁকে কোথায় নামিয়ে দেওয়া হয় কিংবা তিনি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

এদিকে, জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তুরাগ নদ-সংলগ্ন মাজার বস্তি মাঠে কেন গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। প্রথমে মাঠে যাওয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে জানান, তাহসিফ তাঁকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তবে সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য এবং তাঁদের সঙ্গে অন্য কেউ ছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি দীপ। তদন্তকারীরা ওই এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছেন। তাঁদের ধারণা, মাদক কিংবা অন্য কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে সেখানে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এখনো কোনো বিষয় নিশ্চিত হয়নি।

পিবিআই জানিয়েছে, দীপের সর্বশেষ বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল থেকে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরের মাধ্যমে সেটির মালিকানা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপের কল ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর ওই এলাকায় যাওয়ার পর একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। তাহসিফকে খুঁজে না পেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করে তিনি বাসায় ফিরে যান। তাঁর ভাষ্য, রাত দেড়টা থেকে দুইটার মধ্যে বাসায় পৌঁছান।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। নৌ-পুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজে তরুণীকে দেখা গেলেও তাঁর পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁকে শনাক্ত করা গেলে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে, তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমও দীপের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, দীপ একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী, কিডনি, রক্ত ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক ধারণা, পানিতে ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

এটি হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো ঘটনার পরিণতি—তা এখনো স্পষ্ট নয়। অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীর সন্ধান, দীপের বক্তব্যের অসংগতি এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফল—তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে তদন্ত চলছে।