রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র শনিবার যেন পরিণত হয়েছিল শোক, স্মৃতি আর প্রত্যাশার এক আবেগঘন মিলনমেলায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে নিজেদের বেদনা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং ন্যায়বিচারের দাবি তুলে ধরেন।

জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জুলাই জাতীয় সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শহীদ ও আহতদের স্বজনরা একে একে তাদের না-বলা কষ্টের কথা তুলে ধরেন। বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পুরো মিলনায়তনজুড়ে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।

শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আব্দুল রব মিয়া বলেন, প্রতি বছর জুলাই এলেই তার ছেলেকে হারানোর স্মৃতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তিনি অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং এ হত্যাকাণ্ডসহ সব জুলাই হত্যার বিচার দাবি করেন।

চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম বলেন, তার ছেলে আর ফিরে আসবে না, তবে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবার এমন শোকের মুখোমুখি না হয়। একই সঙ্গে আহতদের পুনর্বাসন ও সহায়তার দাবি জানান তিনি।

আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, তার ভাইয়ের আত্মত্যাগ অনেককে আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি নিহতদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সারা দেশে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা নিজের পরিবারের কঠিন সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বড় ছেলেকে হারানোর পর ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় নানা জায়গায় সহায়তা না পেলেও ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্যরা পাশে ছিলেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বিদেশে অবস্থানকালে তাদের খোঁজখবর নিয়েছিলেন। তার একমাত্র প্রত্যাশা—সব জুলাই হত্যার বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।

শহীদ আলভীর বাবা আবুল হাসান অভিযোগ করেন, দুই বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারের সময়ে তার ছেলেসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হবে।

আহত জুলাই যোদ্ধা শাহীন মালু, যিনি আন্দোলনে দুই পা হারিয়েছেন, বলেন, নিজের শারীরিক ক্ষতির চেয়েও তার বড় প্রত্যাশা হলো শহীদদের হত্যার বিচার দেখে যাওয়া। একই ধরনের প্রত্যাশার কথা জানান আহত মিল্লাত হোসেন, সুজন মোল্লা, আলামিন ও মেহেদী হাসান মিরাজও। তারা চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকজন শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত জুলাই যোদ্ধার হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন। পরে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সরকারের মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪। অন্যদিকে, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।