https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে শান্তিবাদী সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর করেই চলেছে জাপান। তবে পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতা এবং ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে এবার বড় কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে টোকিও।
এই প্রেক্ষাপটে দেশটি গঠন করেছে ‘ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (এনআইবি)’, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ বা যুক্তরাজ্যের এমআই৬-এর মতো শক্তিশালী বৈদেশিক গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করবে।
দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়হীন ও দুর্বল গোয়েন্দা ব্যবস্থার কারণে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে জাপানকে ‘গুপ্তচরদের স্বর্গরাজ্য’ বলেও আখ্যা দেওয়া হতো। এতদিন ক্যাবিনেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ অফিস (সিআইআরও) প্রধান তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা হলেও তাদের আইনি ক্ষমতা ছিল সীমিত। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, বিচার মন্ত্রণালয় ও জাতীয় পুলিশ বাহিনীর পৃথক গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর মধ্যে বাধ্যতামূলক তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা ছিল না।
জাপানে দীর্ঘদিন কোনো কার্যকর গুপ্তচরবৃত্তিবিরোধী আইনও ছিল না। ফলে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার জন্য সংবেদনশীল সামরিক ও প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহ তুলনামূলক সহজ ছিল। সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে জাপানি প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল-এর অধীনে পরিচালিত হবে এনআইবি। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, জাতীয় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এখন থেকে বাধ্যতামূলকভাবে গোয়েন্দা তথ্য এই কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে, যাতে দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ হলো উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। পাশাপাশি তাইওয়ান প্রণালি ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের উত্তেজনার কারণে জাপানে অবস্থানরত প্রায় ৫৫ হাজার মার্কিন সেনার নিরাপত্তা এবং সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা মিত্ররা দীর্ঘদিন ধরে টোকিওকে আরও শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন ও আধুনিক গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তাদের মতে, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া উচ্চমাত্রার গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি সম্ভব নয়।
তবে এই সংস্কার নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং নাগরিক অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত বিচারিক ও সংসদীয় নজরদারি ছাড়া নতুন গোয়েন্দা সংস্থাকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে তা ভবিষ্যতে নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানের এই পদক্ষেপ শুধু একটি নতুন গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং বদলে যাওয়া বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় দেশটির কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পুনর্বিন্যাস। এখন দেখার বিষয়, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ভারসাম্য টোকিও কতটা সফলভাবে বজায় রাখতে পারে।