https://timenewsbangla.com

ছবি: -ফাইল ছবি
বিমানবন্দরে যাত্রীদের চোখে তারা সেবাদানকারী কর্মী। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই পরিচয় ও কর্মক্ষেত্রের বিশেষ সুবিধাকেই কাজে লাগিয়ে একটি চক্র কেবিন ক্রুদের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রা ও সোনা পাচার করছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এবং তদন্তে উঠে আসা তথ্য বলছে, বিষয়টি আর বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে হুন্ডি ও চোরাচালান চক্রের যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কেবিন ক্রুদের বিদেশি ভাতার অর্থ নিয়ে ওঠা অভিযোগ। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ মে দুবাইয়ের জনতা ব্যাংক শাখা থেকে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স বাবদ প্রায় ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল বিমানের এক ফ্লাইট স্টুয়ার্ডের নামে।
পরদিন সংশ্লিষ্ট কেবিন ক্রুরা দুবাই থেকে ঢাকায় ফেরেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে তাদের লাগেজে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ২৬ লাখ টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। কিন্তু উত্তোলন করা বিপুল পরিমাণ দিরহামের বড় অংশের হিসাব পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীদের সন্দেহ, সেই অর্থের একটি অংশ হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের ধরনটি আরও স্পষ্ট হয় তদন্তে উঠে আসা আরেকটি ঘটনায়। গত ২২ এপ্রিল ১৬০ জন কেবিন ক্রুর প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহামের ওভারসিজ অ্যালাওয়েন্স একজন ফ্লাইট স্টুয়ার্ডের নামে ইস্যু করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেই অর্থ একটি চেকের মাধ্যমে তুলে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে এনে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এর অর্থ দাঁড়ায়, বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনার বৈধ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে একটি সমান্তরাল আর্থিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হয়, অন্যদিকে অর্থের প্রকৃত উৎস ও গন্তব্য আড়াল করার সুযোগ তৈরি হয়।
কেবিন ক্রুদের বিরুদ্ধে অবশ্য শুধু অর্থ পাচারের অভিযোগই নেই। বিভিন্ন সময়ে তাদের সোনা পাচারের সঙ্গেও জড়িত থাকার ঘটনা সামনে এসেছে। কয়েক বছর আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানের এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ১১ কেজি সোনাসহ আটক হন। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের কিং আবদুল আজিজ বিমানবন্দরে সাতটি সোনার বারসহ এক কেবিন ক্রু আটক হন। ২০২৪ সালের অক্টোবরে শাহজালাল বিমানবন্দরে সোনার বারসহ আরেক কেবিন ক্রু ধরা পড়েন।
কেন পাচারের জন্য কেবিন ক্রুদের বেছে নেওয়া হচ্ছে, সেটিও তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিমানকর্মীদের জন্য রয়েছে আলাদা প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থা। দায়িত্ব পালনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ যাত্রীদের মতো দীর্ঘ তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয় না। আন্তর্জাতিক ট্রানজিট এলাকাতেও তাদের চলাচলের সুযোগ তুলনামূলক বেশি। একই রুটে নিয়মিত যাতায়াতের কারণে বিমানবন্দরের বিভিন্ন ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিতিও তৈরি হয়।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চক্রগুলো যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ ব্যবহার করে থাকতে পারে। কোথায় অর্থ বা সোনার চালান হস্তান্তর হবে, তা জানাতে সাংকেতিক বার্তা ব্যবহারের তথ্যও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, এমন অভিযোগের পর নজরদারি কতটা কঠোর হবে। সন্দেহভাজন কেবিন ক্রুদের ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদের হিসাব পর্যবেক্ষণ, আকস্মিক দেহ ও লাগেজ তল্লাশি এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে বাড়তি নজরদারির সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে শুধু কয়েকজন কর্মীকে শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অর্থ কোথা থেকে আসছে, কার মাধ্যমে বিদেশে যাচ্ছে, দেশে কারা তা গ্রহণ করছে এবং বিমানবন্দরের কোথায় নিরাপত্তার ফাঁক তৈরি হচ্ছে—পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন বড় পরীক্ষা। কারণ কেবিন ক্রু যদি সত্যিই পাচার চক্রের বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের পেছনে থাকা মূল হোতাদের কাছে পৌঁছানো ছাড়া এই পথ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।