https://timenewsbangla.com

ছবি: -সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও। একসময় ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে দীর্ঘপথের যাত্রায় দুবাই, দোহা ও আবুধাবি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব। এখন নিরাপত্তা উদ্বেগে অনেক যাত্রী এসব রুট এড়িয়ে সরাসরি ফ্লাইট কিংবা এশিয়ার বিকল্প বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন।
যুদ্ধ শুরুর পর এশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলাচলকারী ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নিউইয়র্কভিত্তিক বিমান চলাচল পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অল্টন এভিয়েশন কনসালট্যান্সির হিসাবে, এপ্রিল মাসে এ ধরনের যাত্রী চলাচল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৭ শতাংশ কমে যায়।
দুবাই, দোহা ও আবুধাবি গত দুই দশকে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বিমান হাব হিসেবে গড়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের ৪১ কোটি ৭০ লাখ ট্রানজিট যাত্রীর ১৬ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর ব্যবহার করেছেন।
তবে যুদ্ধের কারণে এসব বিমানবন্দর ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় অনেক ফ্লাইট বাতিল, স্থগিত কিংবা বিকল্প পথে পরিচালিত হয়েছে। ফলে যাত্রীরা এখন নতুন সংযোগস্থল খুঁজছেন। আর সেই সুযোগ সবচেয়ে বেশি কাজে লাগাচ্ছে এশিয়ার বড় বিমানবন্দরগুলো।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এর অন্যতম বড় সুবিধাভোগী। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিমানবন্দরটির ট্রানজিট যাত্রী আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপগামী রুটে এই প্রবৃদ্ধি আরও বেশি—৬৩ শতাংশ।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধে ইনচন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে দুবাই ও লন্ডনের হিথরোর মতো দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিমান হাবকে পেছনে ফেলেছে সিউল।
তবে শুধু সিউল নয়, হংকং, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরও বাড়তি যাত্রী পাচ্ছে। হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল ১১ শতাংশের বেশি এবং তাইওয়ানের তাওইউয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরও নতুন এই চাহিদার সুবিধা পাচ্ছে। ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী প্রায় প্রতি চারজন যাত্রীর একজন এই বিমানবন্দরকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেন। বাড়তি চাহিদা সামলাতে মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন এয়ারলাইন সিঙ্গাপুরের সঙ্গে লন্ডন, মিউনিখ, প্যারিস ও সিডনির মতো শহরের ৮০০টির বেশি অতিরিক্ত ফ্লাইট যুক্ত করেছে।
পরিবর্তিত রুটের সুফল পাচ্ছে এশিয়ার এয়ারলাইনগুলোও। হংকংভিত্তিক ক্যাথে প্যাসিফিকের যাত্রী সংখ্যা মার্চে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের যাত্রী চলাচল বেড়েছে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে টার্কিশ এয়ারলাইনস চীন, হংকং ও থাইল্যান্ডে সক্ষমতা বাড়িয়েছে। লুফথানসা গ্রুপ এবং এয়ার ফ্রান্সও এশিয়াগামী রুটে বাড়তি চাহিদা সামলাতে ফ্লাইট ও উড়োজাহাজের সংখ্যা পুনর্বিন্যাস করেছে।
ট্রানজিট যাত্রী বাড়ার অর্থ শুধু বেশি ফ্লাইট নয়, বিমানবন্দরগুলোর বাড়তি আয়ও। যাত্রীদের প্যাসেঞ্জার ফি ছাড়াও দোকান, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবায় তাদের ব্যয় বিমানবন্দরগুলোর গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে, একজন যাত্রী গড়ে প্রায় ৭ দশমিক ৫৭ ডলার বিমানবন্দরের কেনাকাটা, খাবার ও অন্যান্য বিমান চলাচল-বহির্ভূত খাতে ব্যয় করেন।
তবে এশিয়ার বিমানবন্দরগুলোর এই বাড়তি সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যাত্রীদের একটি অংশ আবার দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো পুরোনো ট্রানজিট হাব বেছে নিতে পারেন। এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের এয়ারলাইনগুলো যাত্রীদের আস্থা ফেরাতে ভাড়ায় ছাড়সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
ফলে যুদ্ধের কারণে আপাতত সিউল, হংকং ও সিঙ্গাপুর নতুন সুবিধাভোগী হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন নাকি সাময়িক প্রবণতা, তা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যাত্রীদের আস্থার ওপর।
একটি বিষয় অবশ্য স্পষ্ট—যুদ্ধ শুধু আকাশপথের নিরাপত্তা বদলাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে বিশ্বের দীর্ঘপথের যাত্রীদের যাত্রাবিরতির মানচিত্রও।